বেলস পালসি কি?
বেলস পালসি হলো মুখের এক ধরনের প্যারালাইসিস, যার ফলে মুখের একপাশ হঠাৎ করে দুর্বল বা সম্পূর্ণভাবে অবশ হয়ে যায়। এই অবস্থাকে ফেসিয়াল প্যারালাইসিসও বলা হয়। আমাদের মস্তিষ্ক থেকে আসা সপ্তম করোটিক স্নায়ু (Cranial Nerve VII), যা ফেসিয়াল নার্ভ নামে পরিচিত, মুখের পেশিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কোনো কারণে এই স্নায়ুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ফুলে যায়, তখন এটি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, যার ফলে মুখের একদিকের পেশিগুলো অসাড় হয়ে পড়ে।
বেলস পালসির সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এটি সাধারণত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ঘটে বলে মনে করা হয়, যেমন হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস যা ঠোঁটে ঘা সৃষ্টি করে। এছাড়াও, এই অবস্থাটি ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশি হতে দেখা যায়, কারণ ঠান্ডা লাগার কারণে স্নায়ু সংকুচিত হতে পারে।
বেলস পালসির প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
- মুখের একদিক ঝুলে পড়া বা বাঁকা হয়ে যাওয়া।
- একদিকের চোখ ঠিকমতো বন্ধ করতে না পারা।
- হাসতে, খেতে বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া।
- মুখের একদিকের স্বাদ অনুভূতি কমে যাওয়া।
এই অবস্থা সাধারণত অস্থায়ী এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে সেরে ওঠার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন বেলস পালসিতে আক্রান্ত হন। এটি পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই হতে পারে, তবে কিছু গবেষণায় মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা সামান্য বেশি দেখা গেছে। সাধারণত, এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে ২০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যেহেতু বেলস পালসি স্নায়ুর সমস্যার কারণে ঘটে, তাই এটি কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়, বরং এটি নিজে একটি স্বতন্ত্র অবস্থা। তবুও, এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে অন্যান্য গুরুতর রোগ যেমন স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাতিল করা যায়।
বেলস পালসি কেন হয়?
এটি সাধারনত বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে তবে এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কারন হলোঃ
ঠান্ডা বা আঘাতজনিত কারন, ভাইরাস সংক্রমন, মস্তিষ্কের স্ট্রোক, মুখে টিউমার, হেড ইঞ্জুরি, মুখে অস্ত্রোপচার এর পরবর্তী জটিলতায় ও হতে পারে।
কখন বুঝবেন আপনার বেলস পালসি হয়েছে?
বেলস্ পালসি সাধারণত খুব হঠাৎ করে শুরু হয় এবং এর লক্ষণগুলো এতটাই স্পষ্ট হয় যে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন যে আপনার মুখের পেশিতে কোনো সমস্যা হয়েছে। অনেক সময় ঘুম থেকে ওঠার পর আপনি হঠাৎ খেয়াল করবেন আপনার মুখটা একপাশে ভার ভার লাগছে বা ঝুলে গেছে। কিছু সহজ কাজ যেমন, মুখে পানি নিয়ে কুলি করার চেষ্টা করলে দেখবেন পানি একপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে, কারণ আপনার মুখের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে গেছে।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে: আপনি দেখবেন মুখের একদিকের হাসি বাঁকা দেখাচ্ছে, একপাশের ভ্রু উপরে তুলতে পারছেন না এবং সেই দিকের চোখ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষণগুলো সাধারণত কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকাশ পায় এবং এগুলোই নিশ্চিতভাবে বলে দেয় যে আপনার বেলস পালসি হয়েছে। এমন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ কিছু ক্ষেত্রে এগুলি স্ট্রোকের মতো আরও গুরুতর সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা দেয় এই রোগের?
বেলস্ পালসি হলে মুখের পেশিগুলো অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বেশ কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়। এই লক্ষণগুলো সাধারণত খুব দ্রুত প্রকাশ পায় এবং রোগীর দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। নিচে এই রোগের প্রধান লক্ষণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
- মুখ বাঁকা হয়ে যাওয়া: আক্রান্ত রোগীর মুখের একপাশ বেঁকে বা ঝুলে যায়। এটি মুখের সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন এবং হাসার চেষ্টা করলে এটি আরও স্পষ্ট হয়।
- চোখ বন্ধ না হওয়া: আক্রান্ত দিকের চোখের পাতা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যায় না। ফলে চোখ শুকনো হয়ে যায় এবং জ্বালাপোড়া করে। এর কারণে চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়তে থাকে।
- খাবার গিলতে ও কপাল ভাঁজ করতে কষ্ট হওয়া: মুখের পেশির দুর্বলতার কারণে খাবার গিলতে বা মুখের মধ্যে ধরে রাখতে সমস্যা হয়। কপাল ভাঁজ করতেও রোগী অক্ষম হন, কারণ সেই দিকের পেশিগুলো সাড়া দেয় না।
- মুখের একপাশ থেকে খাবার বা পানি পড়ে যাওয়া: যেহেতু মুখের একদিকের পেশিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তাই কোনো কিছু পান করার সময় বা কুলি করার সময় পানি মুখের একপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে। একইভাবে, খাবার চিবাতে গেলেও তা মুখের একপাশে জমে থাকে বা পড়ে যায়।
- কথাবার্তা ও অভিব্যক্তি প্রকাশে সমস্যা: মুখের পেশির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে স্পষ্টভাবে কথা বলতে সমস্যা হয়। এছাড়া, হাসা, রাগান্বিত হওয়া বা অন্যান্য মুখের অভিব্যক্তি প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- দীর্ঘ সময় কথা বলতে সমস্যা: পেশির দুর্বলতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললে রোগী ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং কথা জড়িয়ে যেতে পারে।
বেলস পালসির ঝুঁকিতে কারা বেশি আছে?
কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু মানুষের বেলস পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। গর্ভবতী মহিলাদের, বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে, এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও বেলস পালসি দেখা দেওয়ার প্রবণতা বেশি। এছাড়াও, যারা অতিরিক্ত স্থূল এবং যাদের শরীরে ভিটামিন-সি এর ঘাটতি রয়েছে, তাদেরও ঝুঁকি বেশি থাকে। পারিবারিক ইতিহাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ; যদি পরিবারের অন্য কারো এই রোগ হয়ে থাকে, তবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
আরও দেখুনঃ বেলস পালসির চিকিৎসা বা ব্যায়াম
আরও পড়ুনঃ সেরিব্রাল পালসি-সিপি
বেলস পালসির ধাপ বা গ্রেট সমূহ

আমরা Bell’s palsy কে ৬ টি গ্রেটে বা ধাপে বিভক্ত করে থাকি। নিম্নে ধাপগুলি বর্ণনা করা হল।
বেলস পালসি রোগটিকে মুখের পেশীর কার্যকারিতা অনুযায়ী ৬টি ধাপে বা গ্রেডে বিভক্ত করা হয়। এটি চিকিৎসকদের রোগের তীব্রতা বুঝতে এবং চিকিৎসার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে।
গ্রেড ১: স্বাভাবিক (Normal)
এই ধাপে মুখের পেশীর কার্যকারিতা সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক থাকে। রোগীর হাসা, ভ্রু নড়াচড়া করা, চোখ বন্ধ করা ইত্যাদি কোনো কাজে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা সমস্যা থাকে না।
গ্রেড ২: হালকা দুর্বলতা (Mild Weakness)
এই ধাপে কিছুটা দুর্বলতা দেখা যায়, তবে তা খুব বেশি গুরুতর নয়।
- ভ্রু এবং চোখ: রোগী সহজেই ভ্রু উপরে তুলতে পারেন এবং চোখ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে পারেন। তবে, যদি কেউ জোর করে চোখ খোলার চেষ্টা করে, তবে আক্রান্ত পাশের চোখটি সহজেই খুলে যায়, যা স্বাভাবিক চোখের ক্ষেত্রে হয় না।
- মুখের অভিব্যক্তি: হাসলে মুখের একপাশে সামান্য দুর্বলতা দেখা যায়, তবে তা সহজেই বোঝা যায় না।
গ্রেড ৩: মাঝারি দুর্বলতা (Moderate Weakness)
এই ধাপে মুখের পেশীগুলোতে মাঝারি মাত্রার দুর্বলতা থাকে।
- ভ্রু এবং চোখ: ভ্রু সামান্য উপরে তোলা যায়। চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য রোগীকে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হয়।
- মুখের অভিব্যক্তি: হাসলে মুখের একপাশে স্পষ্টভাবেই বাঁকা হয়ে যায়, যা সহজেই বোঝা যায়।
- সামগ্রিক অবস্থা: এটি এমন একটি ধাপ যেখানে রোগীর দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা অসুবিধা হয়।
গ্রেড ৪: গুরুতর দুর্বলতা (Severe Weakness)
এই ধাপে দুর্বলতার মাত্রা বেশ গুরুতর।
- ভ্রু এবং চোখ: ভ্রু নড়াচড়া করা বা উপরে তোলা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করা গেলেও চোখের নিচে সামান্য ফাঁকা থেকে যায়।
- মুখের অভিব্যক্তি: রোগী হাসতে পারেন, তবে মুখ অত্যধিক বেঁকে যায় এবং চেহারা বিকৃত দেখায়। ঠোঁট সঠিকভাবে নড়াচড়া করানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্রেড ৫: অত্যন্ত গুরুতর দুর্বলতা (Very Severe Weakness)
এটি প্রায় সম্পূর্ণ প্যারালাইসিসের কাছাকাছি একটি অবস্থা।
- ভ্রু এবং চোখ: ভ্রু একেবারেই নড়াচড়া করে না। চোখ সামান্য বন্ধ হলেও তা পুরোপুরি হয় না।
- মুখের অভিব্যক্তি: ঠোঁটের নড়াচড়া খুবই সামান্য থাকে এবং হাসার সময় কোনো ধরনের পেশী নড়াচড়া বোঝা যায় না।
গ্রেড ৬: সম্পূর্ণ প্যারালাইসিস (Complete Paralysis)
এই ধাপটি সবচেয়ে গুরুতর। এখানে মুখের আক্রান্ত পাশের কোনো পেশী একেবারেই কাজ করে না।
- ভ্রু, চোখ এবং ঠোঁট: এই ধাপে আক্রান্ত দিকের ভ্রু নড়ে না এবং চোখ বন্ধ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। রোগী হাসতে পারেন না এবং ঠোঁট প্রসারিত করতে পারেন না। মুখের আক্রান্ত অংশটি সম্পূর্ণ স্থির এবং অবশ থাকে।
কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?
বেলস্ পালসির লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যদিও গ্রেড ১ এবং ২ এর রোগীরা সাধারণত কোনো চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবুও সঠিক রোগ নির্ণয় এবং অন্যান্য গুরুতর রোগ, যেমন স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাতিল করার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। তবে, যদি আপনার মুখের পেশির দুর্বলতা গুরুতর হয় (গ্রেড ৩, ৪, ৫ এবং ৬), তাহলে অবশ্যই চিকিৎসা নিতে হবে। এই ধাপগুলোতে শুধু বিশ্রাম বা ঔষধ যথেষ্ট নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
গুরুতর বেলস্ পালসির ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণ করা আবশ্যক। একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক (BP.T) আপনার রোগের তীব্রতা এবং গ্রেড অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করবেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিলে ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য ১-২ মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। ফিজিওথেরাপি মুখের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করতে, রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে এবং স্নায়ুকে পুনরায় কার্যকর করতে সাহায্য করে, যা দ্রুত সেরে ওঠার জন্য অপরিহার্য।
রোগীর কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?
চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে রোগীকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।
যেমন-
- ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে
- ঠান্ডা জাতীয় খাবার যেমন আইসক্রিম ও ফ্রিজের ঠাণ্ডা খাবার পরিহার করতে হবে।
- বাইরে বা রোদে গেলে সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে যেন আক্রান্ত চোখে ময়লা না ঢুকতে পারে।
- রাতে ঘুমানোর সময় আক্রান্ত চোখের ওপর নরম কাপড় বা রুমাল দিয়ে রাখতে হবে যাতে কোনোকিছু চোখের মধ্যে না পড়ে।
- ফিজিওথেরাপিষ্ট এর পরামর্শ অনুযায়ী ব্যয়াম করতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বেলস পালসি হলে কোন ডাক্তার দেখাবো?
আপনার বেলস পালসি হলে অবশ্যই একজন নিউরোলজিষ্ট ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের শরনাপর্ণ হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।
বেলস পালসি রোগের ব্যায়াম?
আপনাকে অবশ্যই একজন ফিজিওথেরাপিষ্টের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করতে হবে।
লিখেছেন-
ডাঃ আরাফাত হোসেন, পিটি
ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট
ভিশন ফিজিওথেরাপী সেন্টার, উত্তরা শাখা
পরামর্শ পেতে – 01760-636324 , 01932-797229 (সকাল ৯.০০ থেকে রাত ৯.০০ টা) এই নম্বরে কল করুন এবং এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিন।
আমাদের ফেইসবুক পেইজঃ ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টার