মেয়েদের মধ্যে তলপেটে ব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, এর কারণ সবসময় এক হয় না। এই ব্যথা কখনও হালকা আবার কখনও গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে। একইভাবে কোমর ব্যথাও একটি পরিচিত শারীরিক অস্বস্তি। সাধারণত, তলপেটের ব্যথা এবং কোমর ব্যথা উভয়েরই কারণ হিসেবে মাসিক চক্রের সমস্যা, জরায়ু বা ডিম্বাশয়ের রোগ, মূত্রনালীর সংক্রমণ, অথবা পেশী ও হাড়ের সমস্যা থাকতে পারে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ব্যথাগুলো নিরীহ, তবে যদি তা তীব্র হয় বা অন্য কোনো লক্ষণের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কোমর ও তলপেটে ব্যথার কারণ
কোমর এবং তলপেটে ব্যথা হওয়া খুবই সাধারণ, এবং এর কারণ অনেক হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যথা সাধারণ হলেও, অনেক সময় তা গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে। এই দুটি স্থানে ব্যথার কিছু সম্ভাব্য কারণ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
তলপেটে ব্যথার কারণ
তলপেটে ব্যথা মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং এর অনেক সম্ভাব্য কারণ রয়েছে:
- মাসিকের ব্যথা: বেশিরভাগ মেয়েদের মাসিকের সময় তলপেটে হালকা থেকে মাঝারি ব্যথা হয়, যাকে ডিসমেনোরিয়া বলে। এটি সাধারণত জরায়ুর সংকোচন থেকে হয়।
- ডিম্বাশয়ের সিস্ট: ডিম্বাশয়ে সিস্ট বা ছোট থলির মতো বস্তু তৈরি হলে তলপেটে ব্যথা হতে পারে। বেশিরভাগ সিস্ট নিরীহ হলেও, কিছু ক্ষেত্রে তা তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করে।
- জরায়ুর ফাইব্রয়েড: জরায়ুতে ছোট টিউমার (ফাইব্রয়েড) তৈরি হলে তা তলপেটে চাপ দিয়ে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।
- এন্ডোমেট্রিওসিস: এই অবস্থায় জরায়ুর টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়, যা তীব্র ব্যথা এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে।
- পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID): এটি প্রজনন অঙ্গের একটি সংক্রমণ, যা যৌনবাহিত রোগের কারণে হতে পারে এবং এটি তলপেটে তীব্র ব্যথা ঘটায়।
কোমর ব্যথার কারণ
কোমর ব্যথা বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন:
- পেশী এবং লিগামেন্টের টান: ভারী কিছু ওঠানো, ভুল ভঙ্গিতে বসা বা দাঁড়ানো অথবা হঠাৎ মোচড় লাগার কারণে কোমরের পেশী বা লিগামেন্টে টান পড়তে পারে। এটি কোমর ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
- হাড়ের সমস্যা: মেরুদণ্ডের কশেরুকা বা ডিস্কে সমস্যা হলে, যেমন ডিস্ক হার্নিয়েশন বা স্পাইনাল স্টেনোসিস, তা স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে তীব্র কোমর ব্যথা ঘটাতে পারে।
- আর্থ্রাইটিস: মেরুদণ্ডের জয়েন্টে প্রদাহের কারণে আর্থ্রাইটিস হলে তা কোমর ব্যথা সৃষ্টি করে।
- কিডনিতে পাথর: কিডনিতে পাথর হলে তীব্র কোমর ব্যথা হতে পারে, যা সাধারণত পেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
উভয় স্থানে ব্যথার কারণ
কিছু ক্ষেত্রে কোমর ও তলপেটে একসাথে ব্যথা হতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো:
- মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI): এই সংক্রমণ মূত্রনালীর যেকোনো অংশে হতে পারে। এর ফলে তলপেট ও কোমরে ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের মতো লক্ষণ দেখা যায়।
- ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS): হজম সংক্রান্ত এই সমস্যাটি তলপেটে ব্যথা এবং পেটে গ্যাস বা ফোলাভাব সৃষ্টি করে, যা পিঠের দিকেও অনুভূত হতে পারে।
- একটোপিক প্রেগনেন্সি: এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি, যেখানে নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়। এটি তলপেটে তীব্র ব্যথা ও রক্তপাত ঘটায়, যা কোমরেও অনুভূত হতে পারে।
পেশীর স্ট্রেন (পেশীতে টান)
কোমর ব্যথার একটি প্রধান কারণ হলো পেশীতে টান লাগা বা মচকে যাওয়া। এটি সাধারণত ভারী জিনিস ওঠানো, হঠাৎ ভুল ভঙ্গিতে নড়াচড়া করা, অথবা কোমরের পেশী অতিরিক্ত ব্যবহার করার কারণে ঘটে থাকে। যখন পেশীতে টান লাগে, তখন কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং এই ব্যথা অনেক সময় তলপেটের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধরনের ব্যথা সাধারণত বিশ্রামের মাধ্যমে এবং কিছু হালকা ব্যায়ামের মাধ্যমে সেরে যায়।
কিডনির সংক্রমণ বা পাথর
কিডনির সমস্যা যেমন সংক্রমণ বা পাথর থেকেও কোমরের নিচের অংশে তীব্র ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা প্রায়শই তলপেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিডনি-সংক্রান্ত ব্যথা সাধারণত শরীরের একপাশে অনুভূত হয় এবং এর সাথে আরও কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে, যেমন: ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া, অথবা জ্বর আসা। এই লক্ষণগুলো দেখলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI)
ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই হলো মূত্রনালীর একটি সংক্রমণ। এর প্রধান লক্ষণ হলো প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, এবং প্রস্রাব ঘোলাটে বা রক্তযুক্ত হওয়া। এই সংক্রমণের কারণে তলপেটে ব্যথা হয়, যা কিছু ক্ষেত্রে কোমরের নিচের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইউটিআই-এর সঠিক চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা
পেট এবং হজম সংক্রান্ত কিছু সমস্যা কোমর ও তলপেটে একই সাথে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ডাইভার্টিকুলাইটিস: এটি অন্ত্রের একটি রোগ, যা ব্যথা এবং অন্যান্য হজমজনিত সমস্যার কারণ হতে পারে।
- ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS): এটি হজমের একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যা তলপেটে ব্যথা, গ্যাস এবং পেটের ফোলাভাব সৃষ্টি করে, যা পিঠের দিকেও অনুভূত হতে পারে।
- ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (IBD): এটি অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ।
- কোষ্ঠকাঠিন্য: দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণেও তলপেটে ও কোমরে চাপ ও ব্যথা হতে পারে।
স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত অবস্থা
মহিলাদের তলপেটে ব্যথার একটি বড় কারণ হতে পারে স্ত্রীরোগ-সংক্রান্ত কিছু সমস্যা। যেমন, ডিম্বাশয়ের সিস্ট বা জরায়ু ফাইব্রয়েড (টিউমার)। এই রোগগুলো তলপেটে ব্যথা সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে কোমরের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়াও, এন্ডোমেট্রিওসিস নামক একটি রোগেও তীব্র ব্যথা হয়, যেখানে জরায়ুর ভেতরের টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়। পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID), যা প্রজনন অঙ্গের একটি সংক্রমণ, সেটিও তলপেটে তীব্র ব্যথা ঘটায়। এই ধরনের ব্যথার সাথে প্রায়ই মাসিকের অনিয়ম বা শারীরিক সম্পর্কের সময় ব্যথাও হতে পারে।
হার্নিয়েটেড ডিস্ক
কোমর ব্যথার একটি গুরুতর কারণ হলো হার্নিয়েটেড ডিস্ক, যা সাধারণত “স্লিপড ডিস্ক” নামে পরিচিত। মেরুদণ্ডের দুটি কশেরুকার মাঝখানে থাকা নরম ডিস্ক যদি কোনো কারণে সরে যায় বা ফেটে যায়, তবে তা আশেপাশের স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে কোমরে তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং এই ব্যথা তলপেট ও পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যথার পাশাপাশি, আক্রান্ত স্থানে অসাড়তা, ঝিঁঝিঁ পোকা হাঁটার অনুভূতি অথবা পায়ে দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে।
অ্যাপেন্ডিসাইটিস
অ্যাপেন্ডিসাইটিস হলো অ্যাপেন্ডিক্স নামক ছোট অঙ্গটির প্রদাহ। এই অবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে নাভির চারপাশে ব্যথা শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে পেটের নীচের ডানদিকে চলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে, এই ব্যথা পেটের ডানদিক থেকে কোমরের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা তীব্র এবং হঠাৎ করে শুরু হয়। এর সাথে বমি বমি ভাব, জ্বর এবং বমিও হতে পারে। এটি একটি জরুরি অবস্থা এবং অবিলম্বে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

কোমর ও তলপেটে ব্যথা কমানোর উপায়
পেশীর স্ট্রেন, দুর্বল ভঙ্গি, আঘাত, বা অন্তর্নিহিত চিকিৎসা অবস্থা সহ বিভিন্ন কারণে কোমর এবং নীচের পিঠে ব্যথা হতে পারে। যদিও সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা গুরুত্বপূর্ণ, এখানে কিছু সাধারণ টিপস রয়েছে যা কোমর এবং নীচের পিঠের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে:
- সঠিক ভঙ্গি মেনে চলুন: বসার, দাঁড়ানোর বা কোনো জিনিস তোলার সময় আপনার শরীরের ভঙ্গি যেন সঠিক থাকে। কুঁজো হয়ে বসবেন না, সব সময় সোজা হয়ে বসুন। যদি বেশি সময় বসে থাকতে হয়, তাহলে এমন চেয়ার ব্যবহার করুন যা আপনার পিঠকে ভালোভাবে সাপোর্ট দেয়।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত ব্যায়াম করলে আপনার মেরুদণ্ডকে ধরে রাখা পেশীগুলো শক্তিশালী হবে। হাঁটা, সাঁতার কাটা বা যোগব্যায়ামের মতো সহজ ব্যায়ামগুলো খুবই উপকারী। এগুলো আপনার শরীরকে সচল ও সুস্থ রাখবে।
- স্ট্রেচিং বা পেশী প্রসারণ: পেশী টান কমাতে এবং নমনীয়তা বাড়াতে প্রতিদিন হালকা স্ট্রেচিং করুন। বিশেষ করে কোমরের নিচের অংশের পেশীগুলো প্রসারিত করার ওপর মনোযোগ দিন। এটি পেশীর টান কমায় এবং ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে।
- গরম বা ঠান্ডা সেঁক: ব্যথা কমানোর জন্য গরম বা ঠান্ডা সেঁক ব্যবহার করতে পারেন। যদি পেশীতে টান লাগে, তাহলে গরম সেঁক দিন। এতে পেশী আরাম পায় এবং রক্ত চলাচল বাড়ে। ফোলা বা প্রদাহ থাকলে ঠান্ডা সেঁক দিলে ভালো কাজ হয়।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: শরীরের অতিরিক্ত ওজন আপনার পিঠের ওপর চাপ বাড়ায়, যা ব্যথার কারণ হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে এবং ব্যায়াম করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- মানসিক চাপ কমান: মানসিক চাপ পেশী শক্ত করে দেয়, যা ব্যথা বাড়াতে পারে। তাই ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা আপনার পছন্দের কোনো শখের মাধ্যমে চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।
- ঘুমানোর অভ্যাস বদলান: ভালো মানের গদি ও বালিশ ব্যবহার করুন যা আপনার পিঠকে সঠিকভাবে সাপোর্ট দেয়। পেটে ভর দিয়ে ঘুমানো এড়িয়ে চলুন, কারণ এতে ঘাড় ও পিঠে চাপ পড়ে।
- একটানা কাজ থেকে বিরতি নিন: যদি আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়, তবে নিয়মিত বিরতি নিন। এই বিরতির সময় একটু হেঁটে আসুন বা হালকা স্ট্রেচিং করুন।
- সঠিকভাবে জিনিস তুলুন: ভারী জিনিস তোলার সময় পিঠের ওপর চাপ না দিয়ে আপনার পা ব্যবহার করুন। হাঁটু বাঁকিয়ে পিঠ সোজা রেখে পায়ের পেশী দিয়ে জিনিস তুলুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: যদি আপনার ব্যথা খুব তীব্র হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কিছু ক্ষেত্রে আকুপাংচার, ম্যাসাজ থেরাপি বা ফিজিওথেরাপির মতো চিকিৎসা ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
পরিচালনায়ঃ
ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পিটি
বিপিটি ( ঢাবি ) , এমপিটি ( অর্থোপেডিকস ) – এন.আই.পি.এস , ইন্ডিয়া
পিজি.সি. ইন আকুপাংচার , ইন্ডিয়া
স্পেশাল ট্রেইন্ড ইন ওজন থেরাপি , ইউ.এস.এ এবং ওজোন ফোরাম , ইন্ডিয়া ।
ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট , ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টার ।
পরামর্শ পেতে – 01760-636324 , 01932-797229 (সকাল ৯.০০ থেকে রাত ৯.০০ টা)
ফেসবুকঃ ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টার
এপয়েন্টম্যান্ট নিতে ক্লিক করুনঃ
https://visionphysiotherapy.com/appoi..