মাথাব্যথা কমানোর প্রাকৃতিক ঘরোয়া প্রতিকার: প্রাকৃতিক উপায়ে ঘরে বসে আপনার ব্যথা মাথা কমানোর ঘরোয়া উপায় নিয়ে আলোচনা করবো
আমাদের যান্ত্রিক জীবনে মাথা ব্যথা খুব স্বাভাবিক কম বেশি সবাই ভুগে থাকি।কাজের প্রেসার বা অতিরিক্ত চিন্তা থেকে বা শারীরিক জটিলতা থেকেও বিভিন্ন কারনে হতে পারে। তাছাড়াও বিভিন্ন কারণে মাথা ব্যথা হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে দুশ্চিন্তা, মাইগ্রেন, অতিরিক্ত ধূমপান, ব্যথানাশক ওষুধের বেশি খাওয়া, শরীরের পানি শূন্যতা ইত্যাদি।
আমরা অনেকে দ্রুত মাথা ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে ওষুধ খেয়ে থাকি। তবে ওষুধ সবসময় না খাওয়াই ভালো। তবে আপনি যদি হরহামেশাই এই রোগে ভুগে থাকেন তাহলে আবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করতে পারেন। ঘরোয়া কিছু খাবার বা উপায় যা আপনাকে মাথা ব্যথা থেকে নিরাময় দিতে পারে। চলুন জেনে নেয়া যাক কিছু ঘরোয়া উপায়।
মাথা ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
অবশ্যই! মাথা ব্যথা কমানোর জন্য এই ঘরোয়া উপায়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে এবং সহজ ভাষায় বর্ণনা করা হলো, যাতে প্রতিটি পদ্ধতি আপনি ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
১. হাইড্রেটেড থাকা
আমাদের শরীরের ৭০% এর বেশি অংশ জল দিয়ে তৈরি। শরীরের জলের অভাব হলে তা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। একে বলা হয় ডিহাইড্রেশনজনিত মাথাব্যথা। এটি হলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়, যা মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং ব্যথা সৃষ্টি করে।
- পর্যাপ্ত জল পান করুন: সারাদিন ধরে পর্যাপ্ত জল পান করা মাথাব্যথা প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকরী উপায়। যদি আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি ডিহাইড্রেটেড, তবে সাথে সাথেই এক বা দুই গ্লাস জল পান করুন। অনেক সময় দেখা যায়, শুধু জল পান করলেই মাথাব্যথা ধীরে ধীরে কমে আসে। যখন আপনি মাথাব্যথা অনুভব করেন, তখন এক গ্লাস জল পান করে ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন, অনেক সময় এতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হয়।
- শুধু জল নয়, অন্যান্য তরলও গ্রহণ করুন: জল ছাড়াও তাজা ফলের রস, সবজির স্যুপ, বা হার্বাল চা পান করতে পারেন। তবে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় বা ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
২. অ্যারোমাথেরাপি বা সুগন্ধি চিকিৎসা
কিছু নির্দিষ্ট এসেনশিয়াল তেলের সুগন্ধ মনকে শান্ত করতে এবং মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
- পেপারমিন্ট তেল: পেপারমিন্ট তেলের প্রধান উপাদান হলো মেন্থল, যা পেশীকে শিথিল করতে এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। মাথাব্যথা শুরু হলে কপালে, কানের নিচে বা মাথার তালুতে কয়েক ফোঁটা পেপারমিন্ট তেল দিয়ে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। এতে করে শীতল অনুভূতি পাওয়া যায়, যা টেনশনজনিত মাথাব্যথা কমাতে খুব কার্যকরী।
- ল্যাভেন্ডার তেল: ল্যাভেন্ডার তেলের প্রশান্তিদায়ক গুণাগুণ মনকে শান্ত করতে এবং স্ট্রেস কমাতে খুবই কার্যকরী। আপনি একটি ডিফিউজারে কয়েক ফোঁটা ল্যাভেন্ডার তেল দিয়ে রাখতে পারেন বা গরম জলের স্নানে কয়েকটি ফোঁটা যোগ করতে পারেন। এর সুগন্ধ আপনাকে আরাম দেবে এবং স্নায়ুকে শান্ত করবে, যা স্ট্রেসজনিত মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করবে।
৩. ভেষজ প্রতিকার
প্রাচীনকাল থেকেই কিছু ভেষজ ঔষধি গুণাগুণের জন্য পরিচিত।
- আদা: আদার মধ্যে থাকা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (প্রদাহরোধী) উপাদান মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করে। একটি পাত্রে গরম জলে তাজা আদার কুচি দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিন। এরপর এটি ছেঁকে নিয়ে ধীরে ধীরে পান করুন। এটি মাইগ্রেনের ব্যথার জন্যও খুব উপকারী।
- ফিভারফিউ: ফিভারফিউ এক ধরনের ভেষজ যা বিশেষ করে মাইগ্রেনের মাথাব্যথার ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে। এটি ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট আকারে পাওয়া যায়। তবে এটি ব্যবহারের আগে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যদি আপনার কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে বা আপনি অন্য কোনো ঔষধ গ্রহণ করে থাকেন।
৪. মাথার ত্বক ও ঘাড়ে মালিশ
টেনশনজনিত মাথাব্যথার একটি সাধারণ কারণ হলো ঘাড় ও মাথার পেশীগুলো শক্ত হয়ে যাওয়া।
- পেশী শিথিল করতে মালিশ: আপনার আঙুলের ডগা ব্যবহার করে মাথার ত্বক, ঘাড় এবং কাঁধে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। বৃত্তাকার গতিতে চাপ প্রয়োগ করুন। এটি পেশীগুলোকে শিথিল করে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, যা ব্যথার উপশম ঘটায়। আপনি চাইলে ম্যাসেজের জন্য সামান্য নারকেল বা বাদাম তেলও ব্যবহার করতে পারেন।
৫. ঠাণ্ডা বা উষ্ণ সেঁক
তাপমাত্রা দিয়েও মাথাব্যথা কমানো সম্ভব।
- ঠাণ্ডা সেঁক: একটি কাপড়ে বরফের টুকরো মুড়িয়ে বা একটি আইস প্যাক দিয়ে ১৫-২০ মিনিটের জন্য কপালে বা ঘাড়ের পেছনে সেঁক দিন। এটি রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে, যা ব্যথা এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করে। মাইগ্রেনের ব্যথায় এই পদ্ধতি খুব কার্যকর।
- উষ্ণ সেঁক: বিকল্পভাবে, একটি গরম তোয়ালে বা হিটিং প্যাড ব্যবহার করে উষ্ণ সেঁক দিন। এটি পেশীর টান কমাতে এবং রক্তপ্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করে। অনেক সময় ঘাড়ের পেশী শক্ত হয়ে মাথা ব্যথা হয়, সেক্ষেত্রে উষ্ণ সেঁক খুব আরামদায়ক হতে পারে। আপনার জন্য কোনটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে তা পরীক্ষা করে দেখুন।
৬. শিথিলকরণ কৌশল
মানসিক চাপ মাথাব্যথার একটি বড় কারণ। তাই মনকে শান্ত করতে কিছু কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে।
- গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস: শান্তভাবে বসুন বা শুয়ে পড়ুন। নাক দিয়ে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং তারপর মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এই প্রক্রিয়াটি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করুন। এটি মনকে শান্ত করে এবং শরীরের চাপের মাত্রা কমায়।
- ধ্যান এবং যোগব্যায়াম: নিয়মিত ধ্যান বা যোগব্যায়াম অনুশীলন করলে মানসিক চাপ অনেক কমে যায়। এই ধরনের অনুশীলন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং আপনাকে দৈনন্দিন জীবনের চাপ সামলাতে সাহায্য করে।
৭. খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন
কিছু খাবার এবং পানীয় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
- ট্রিগার খাবার এড়িয়ে চলুন: এমন কিছু খাবার আছে যা মাথাব্যথা বাড়াতে পারে। যেমন – চকলেট, ক্যাফেইন, প্রক্রিয়াজাত মাংস (সসেজ, হট ডগ), এবং পুরানো চিজ। কোন খাবারগুলো আপনার মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে তা বোঝার জন্য একটি ডায়েরি লিখে রাখুন।
- সুষম খাদ্য গ্রহণ: প্রতিদিন ফল, সবজি, গোটা শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন। নিয়মিত খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে, যা মাথাব্যথা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
৮. ভালো ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি
ঘুমের অভাব বা অতিরিক্ত ঘুম উভয়ই মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
- নিয়মিত ঘুমের রুটিন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন, এমনকি ছুটির দিনেও। এতে আপনার শরীরের প্রাকৃতিক ঘুম চক্র বজায় থাকে।
- আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ: আপনার শোবার ঘরটি অন্ধকার, শান্ত এবং ঠান্ডা রাখুন। ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। ভালো ঘুম শরীর এবং মনকে সতেজ রাখে।
৯. মানসিক চাপ কমানো
মানসিক চাপই অনেক সময় মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- শখ বা জার্নালিং: আপনার পছন্দের কাজগুলো করুন। যেমন – শান্ত সঙ্গীত শোনা, বই পড়া, বাগান করা বা জার্নাল লেখা। এই ধরনের কাজগুলো মনকে বিক্ষিপ্ত করে এবং মানসিক চাপ কমায়।
- প্রিয়জনের সঙ্গ: পরিবার বা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো বা তাদের সাথে আপনার অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া মানসিক চাপ কমানোর একটি দারুণ উপায়।
১০. সক্রিয় জীবনযাপন এবং ব্যায়াম
নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ মাথাব্যথা প্রতিরোধে খুব কার্যকরী।
- নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন হাঁটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো বা যেকোনো হালকা ব্যায়াম করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং পেশীর টান কমে। এটি মাথাব্যথার ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে সাহায্য করে এবং সামগ্রিকভাবে শরীরকে সুস্থ রাখে।
মাথাব্যথা উপশমের জন্য এই প্রাকৃতিক ঘরোয়া প্রতিকারগুলির সাহায্যে, শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভর না করে আপনার ব্যথার মাথা প্রশমিত করার জন্য আপনার কাছে বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। মনে রাখবেন যে প্রত্যেকেই আলাদা, তাই আপনার জন্য কোনটি সবচেয়ে ভাল কাজ করে তা খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন প্রতিকার অন্বেষণ করা এবং পরীক্ষা করা অপরিহার্য। এই প্রাকৃতিক পন্থাগুলিকে আপনার জীবনধারায় অন্তর্ভুক্ত করে, আপনি কার্যকর ত্রাণ পেতে পারেন এবং নিরাপদ এবং সামগ্রিক উপায়ে আপনার মাথাব্যথার উপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারেন।
এছাড়া আরো পড়ুন-
কোমর থেকে পা পর্যন্ত ব্যথার কারণ
মাথা ব্যাথার জন্য কোন ডাক্তার দেখাবেন
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
মাথাব্যথা উপশম করতে ঘরোয়া প্রতিকারের জন্য কতক্ষণ লাগে?
ঘরোয়া প্রতিকারের কার্যকারিতা ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তাদের কাজ করার জন্য সময় দেওয়া এবং আপনার প্রয়োজন অনুসারে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিকারগুলি খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
মাথাব্যথা প্রতিরোধে সাহায্য করার জন্য কোন খাদ্যতালিকাগত বিবেচনা আছে কি?
কিছু খাবার কিছু ব্যক্তির মাথাব্যথা শুরু করতে পারে। সম্ভাব্য ট্রিগার খাবারগুলি সনাক্ত করতে এবং সেগুলি এড়াতে একটি খাদ্য ডায়েরি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
স্ট্রেস কি মাথাব্যথায় অবদান রাখতে পারে?
অবশ্যই, মানসিক চাপ মাথাব্যথার একটি সাধারণ কারণ। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কৌশলগুলি অন্তর্ভুক্ত করা, যেমন ধ্যান বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মাথাব্যথা উপসর্গগুলি উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
এমন কোন ভেষজ চা আছে যা মাথাব্যথায় সাহায্য করতে পারে?
হ্যাঁ, ভেষজ চা যেমন ক্যামোমাইল, পিপারমিন্ট, এবং আদা চা মাথাব্যথা উপশম প্রদান করতে পরিচিত। আপনার জন্য কোনটি সবচেয়ে ভাল কাজ করে তা খুঁজে বের করতে বিভিন্ন চা নিয়ে পরীক্ষা করুন।
লিখেছেন-
ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পিটি
বিপিটি ( ঢাবি ), এমপিটি ( অর্থোপেডিকস ) – এন.আই.পি.এস, ইন্ডিয়া
পিজি.সি. ইন আকুপাংচার, ইন্ডিয়া
স্পেশাল ট্রেইন্ড ইন ওজন থেরাপি, ইউ.এস.এ এবং ওজোন ফোরাম, ইন্ডিয়া।
ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট, ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টার।
পরামর্শ পেতে – 01760-636324 , 01932-797229 (সকাল ৯.০০ থেকে রাত ৯.০০ টা) এই নম্বরে কল করুন এবং এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিন।
আমাদের ফেইসবুক পেইজঃ ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টার